বিশেষ প্রতিবেদন

শিক্ষা–সংস্কৃতি–মানবিকতার আলোকবর্তিকা: ইটাবেড়িয়ার গিরি পরিবার এক অনন্য অনুপ্রেরণা

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে মেদিনীপুর জেলা দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার পীঠস্থান হিসেবে সুপরিচিত। সেই ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ভগবানপুর থানার অন্তর্গত ইটাবেড়িয়া গ্রামের গিরি পরিবার আজও সমাজের সামনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ—এই তিনের সুষম মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই পরিবার নিঃশব্দেই সমাজকে আলোকিত করে চলেছে।এই পরিবারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন প্রয়াত ঈশ্বর ভূপেন্দ্রনাথ গিরি। পেশায় একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই নয়, বরং শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মানবিকতার পাঠ ছাত্রদের হৃদয়ে রোপণ করেছিলেন। সাহিত্য বিষয়ে তাঁর গভীর জ্ঞান, ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে ছাত্রসমাজে এক অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত করেছিল। ৬৫ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ শুধু পরিবারের নয়, সমগ্র এলাকার জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি ছিল।আজও সেই আলোর শিখা বহন করে চলেছেন পরিবারের বর্তমান স্তম্ভ শ্রীমতি বিজলী প্রভা গিরি। বয়স ৯৬ ছুঁলেও তাঁর মনন, স্মৃতি ও কণ্ঠ আজও বিস্ময় জাগায়। রবি ঠাকুরের গীতবিতান ও গীতাঞ্জলি থেকে শুরু করে অসংখ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত তিনি আজও সাবলীলভাবে পরিবেশন করতে পারেন। আবৃতিতে তাঁর দক্ষতা এমন যে, যে কোনো পরিবেশে মুহূর্তের মধ্যেই শ্রোতাদের মুগ্ধ করে তোলেন। বয়স যেন তাঁর কাছে কেবল একটি সংখ্যা—সংস্কৃতি ও চর্চার কাছে হার মানে সময়।আমাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে এই পরিবারের আরও গর্বের অধ্যায়। গিরি পরিবারের পুত্রসন্তানরা প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এবং নিজেদের কর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। কেউ সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল পদে কর্মরত, কেউ বেসরকারি ক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন, আবার কেউ কর্মজীবন সম্পন্ন করে অবসর গ্রহণ করেছেন। সকলেই সততা, নিষ্ঠা ও মূল্যবোধকে জীবনের মূলধন করে সমাজে সম্মান অর্জন করেছেন।আজকের সময়ে যখন মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন ইটাবেড়িয়ার গিরি পরিবার নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এই পরিবার প্রমাণ করে—শিক্ষা কেবল ডিগ্রি নয়, সংস্কৃতি কেবল মঞ্চে সীমাবদ্ধ নয়, আর মানবিকতা কেবল কথার বিষয় নয়; এগুলো জীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে ধারণ করাই আসল উত্তরাধিকার।আজ সেই গৌরবময় পরিবারের কিছু ঝলক আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম—যেন আগামী প্রজন্ম অনুপ্রেরণা খুঁজে পায় এই আলোকিত উত্তরাধিকার থেকে।

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Enable Notifications OK No thanks